সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য

সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য

বাংলা লেখ্য ভাষার দুটি রীতি আছে: সাধু রীতি ও চলিত রীতি। এ ছাড়া মুখের ভাষায় আছে আঞ্চলিক কথ্য রীতি। এই তিনটি রীতির বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য জানা থাকলে লেখার সময় কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে তা সহজে বোঝা যায়।

১. সাধু রীতি

  • ব্যাকরণের নিয়ম মেনে চলে: বাংলা লেখ্য সাধু রীতি সুনির্ধারিত ব্যাকরণের নিয়ম অনুসরণ করে। এর পদবিন্যাস সুনিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট।
  • গুরুগম্ভীর ও তৎসম শব্দবহুল: এ রীতিতে গাম্ভীর্য বেশি এবং তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের প্রাচুর্য থাকে।
  • সংলাপ ও বক্তৃতার অনুপযোগী: সাধু রীতি নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার জন্য উপযুক্ত নয়।
  • নির্দিষ্ট গঠনপদ্ধতি: এ রীতিতে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ এক বিশেষ গঠনপদ্ধতি মেনে চলে।
উদাহরণ: তিনি আমাদের বাড়িতে আসিয়া সকলের সহিত কথা বলিলেন।

২. চলিত রীতি

  • পরিবর্তনশীল: একশ বছর আগে শিষ্ট ও ভদ্রজনের কথিত ভাষা যা মুখে বুলি হিসেবে প্রচলিত ছিল, কালের প্রবাহে বর্তমানে তা অনেকটা পরিবর্তিত রূপ লাভ করেছে।
  • তদ্ভব শব্দবহুল: এ রীতিতে তদ্ভব (সংস্কৃত থেকে বদলে আসা) শব্দ বেশি থাকে।
  • সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য: বক্তৃতা, আলাপ-আলোচনা ও নাট্যসংলাপের জন্য এটি বেশি উপযোগী।
  • সহজতর রূপ: সাধু রীতিতে ব্যবহৃত সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ চলিত রীতিতে পরিবর্তিত ও সহজতর রূপ লাভ করে। অনেক বিশেষ্য ও বিশেষণেও এমন ঘটে।
উদাহরণ: তিনি আমাদের বাড়িতে এসে সবার সঙ্গে কথা বললেন।

৩. আঞ্চলিক কথ্য রীতি

সব ভাষারই আঞ্চলিক রূপে বৈচিত্র্য থাকে, বাংলা ভাষারও তা আছে। বিভিন্ন অঞ্চলে কথিত রীতির বিভিন্নতা লক্ষিত হয়। আবার কোথাও কোথাও কারো কারো উচ্চারণে বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার মিশ্রণও লক্ষ করা যায়।

মনে রাখো: সাধু ও চলিত রীতি লেখার জন্য, আর আঞ্চলিক রীতি মূলত মুখের কথার জন্য। পরীক্ষার খাতা বা আনুষ্ঠানিক লেখায় আঞ্চলিক রীতি ব্যবহার করা উচিত নয়।

সাধু ও চলিত রীতির তুলনা

বিষয়সাধু রীতিচলিত রীতি
ব্যাকরণ ও পদবিন্যাসসুনির্দিষ্ট ও সুনিয়ন্ত্রিতসহজ ও স্বাভাবিক, কালে কালে পরিবর্তনশীল
শব্দভান্ডারতৎসম শব্দবহুলতদ্ভব শব্দবহুল
সুরগুরুগম্ভীরসংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য
সর্বনাম ও ক্রিয়াপদপূর্ণ রূপ (তাহাকে, করিয়া)সংক্ষিপ্ত রূপ (তাকে, করে)
সংলাপ ও বক্তৃতাউপযোগী নয়বেশি উপযোগী
ব্যবহারশুধু লেখায়লেখায় ও মুখে

একই অনুচ্ছেদ, দুই রীতিতে

ক. সাধু রীতি: সন্ধ্যা হইলে আমরা নদীর তীরে বেড়াইতে গিয়াছিলাম। সেখানে একজন বৃদ্ধ মাঝি নৌকা বাঁধিয়া বসিয়া ছিলেন। তিনি আমাদিগকে দেখিয়া হাসিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তোমরা কোথা হইতে আসিয়াছ?’
খ. চলিত রীতি: সন্ধ্যা হলে আমরা নদীর তীরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন বৃদ্ধ মাঝি নৌকা বেঁধে বসে ছিলেন। তিনি আমাদের দেখে হাসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কোথা থেকে এসেছ?’

দুটি অনুচ্ছেদে একই কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ক্রিয়াপদ ও সর্বনামের রূপ আলাদা। এই রূপের তফাতই সাধু ও চলিতকে আলাদা করে।

পদ অনুযায়ী সাধু ও চলিত রূপের পার্থক্য

নিচের ছকে বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয় পদের সাধু ও চলিত রূপ দেখানো হলো। পরীক্ষার জন্য এগুলো মুখস্থ না করে নিয়মটা বুঝে নাও।

পদসাধুচলিত
বিশেষ্যমস্তকমাথা
বিশেষ্যজুতাজুতো
বিশেষ্যতুলাতুলো
বিশেষণশুষ্ক / শুকনাশুকনো
বিশেষণবন্যবুনো
সর্বনামতাঁহারা / উহারাতাঁরা / ওঁরা
সর্বনামতাহাকে / উহাকেতাকে / ওকে
সর্বনামতাহার / তাঁহারতার / তাঁর
ক্রিয়াকরিবারকরবার / করার
ক্রিয়াপাইয়াছিলেনপেয়েছিলেন
ক্রিয়াহইলেনহলেন
ক্রিয়াআসিয়াএসে
ক্রিয়াহইলহল / হলো
ক্রিয়াদেখিয়াদেখে
ক্রিয়াকরিলেনকরলেন
ক্রিয়াদেন নাইদেননি
ক্রিয়াপার হইয়াপেরিয়ে
ক্রিয়াপড়িলপড়ল / পড়লো
ক্রিয়াকরিয়াকরে
ক্রিয়াভাঙিয়া যাইতে লাগিলভেঙে যেতে লাগল
ক্রিয়াফুটিয়া রহিয়াছেফুটে রয়েছে
অব্যয়পূর্বেইআগেই
অব্যয়সহিতসঙ্গে / সাথে

সহজে চেনার কৌশল

  • ক্রিয়া দেখো: শেষে -ইয়া, -ইল, -ইতে, -ইলেন থাকলে (করিয়া, পড়িল, যাইতে, করিলেন) সাধু। -এ, -ল, -তে, -লেন থাকলে (করে, পড়ল, যেতে, করলেন) চলিত।
  • সর্বনাম দেখো: তাহা, যাহা, তাহার, উহারা সাধু। তা, যা, তার, ওরা চলিত।
  • না-বোধক ক্রিয়া: সাধু রীতিতে ‘নাই’ (দেন নাই), চলিত রীতিতে ‘নি’ (দেননি)।
  • এক রচনায় একই রীতি: সাধু ও চলিত মিশিয়ে ফেললে গুরুচণ্ডালী দোষ হয়, তাই পুরো লেখায় একই রীতি ধরে রাখো।

সারসংক্ষেপ

  • সাধু রীতি ব্যাকরণের নিয়মে সুনির্দিষ্ট, গুরুগম্ভীর ও তৎসম শব্দবহুল।
  • চলিত রীতি সহজ, সংক্ষিপ্ত, তদ্ভব শব্দবহুল এবং সংলাপ ও বক্তৃতার উপযোগী।
  • সাধু রীতির সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ চলিত রীতিতে সংক্ষিপ্ত ও সহজ হয়ে যায়।
  • আঞ্চলিক কথ্য রীতি অঞ্চলভেদে আলাদা, তাই লেখায় তা ব্যবহার করা হয় না।

অনুশীলনী

  1. সাধু রীতির বৈশিষ্ট্যগুলো লেখো।
  2. চলিত রীতি সাধু রীতি থেকে কীভাবে আলাদা? তিনটি পার্থক্য লেখো।
  3. আঞ্চলিক কথ্য রীতি বলতে কী বোঝায়?
  4. নিচের সাধু শব্দগুলোর চলিত রূপ লেখো: মস্তক, জুতা, বন্য, তাহাকে, পাইয়াছিলেন, দেখিয়া, সহিত।
  5. চলিত রীতিতে রূপান্তর করো: (ক) পড়িল। (খ) ফুটিয়া রহিয়াছে। (গ) তাঁহারা আসিয়া দেখিলেন।
  6. সাধু রীতিতে রূপান্তর করো: (ক) দেননি। (খ) হল। (গ) আগেই।