সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি ও যুক্তব্যঞ্জনবর্ণ

সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি ও যুক্তব্যঞ্জনবর্ণ

বাংলা ভাষায় অনেক শব্দে দুটি বা তিনটি ব্যঞ্জন গায়ে গায়ে জুড়ে থাকে। যেমন ‘রক্ত’ বা ‘শিক্ষা’ লেখার সময় আমরা ক্ত, ক্ষ ব্যবহার করি। এগুলোই সংযুক্ত ব্যঞ্জন। এই অংশ থেকে পরীক্ষায় বানান ও যুক্তবর্ণ বিশ্লেষণের প্রশ্ন প্রায়ই আসে।

সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি ও যুক্তব্যঞ্জনবর্ণ

সংজ্ঞা: দুটি বা তার চেয়ে বেশি ব্যঞ্জনধ্বনির মধ্যে কোনো স্বরধ্বনি না থাকলে সে ব্যঞ্জনধ্বনি দুটি বা ধ্বনি কয়টি একত্রে উচ্চারিত হয়। এরূপ যুক্তব্যঞ্জনধ্বনির দ্যোতনার জন্য দুটি বা অধিক ব্যঞ্জনবর্ণ একত্রিত হয়ে সংযুক্ত বর্ণ (ligature) গঠিত হয়।

সাধারণত এরূপে গঠিত সংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের মূল রূপ বা আকৃতি পরিবর্তিত হয়।

উদাহরণ: তক্তা = ত্ + অ + ক্ + ত্ + আ। এখানে দ্বিতীয় বর্ণ ‘ক’ ও ‘ত’-এর মূল রূপ পরিবর্তিত হয়ে ‘ক্ত’ হয়েছে।

সংযুক্ত ব্যঞ্জন গঠনের তিনটি উপায়

বাংলা ভাষায় সাধারণত তিনভাবে সংযুক্ত ব্যঞ্জন গঠিত হতে পারে:

ক্রমউপায়
ককার সহযোগে
খফলা সহযোগে
গব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ব্যঞ্জনবর্ণ (ফলা ব্যতীত) সহযোগে

ক. কার সহযোগে

স্বরবর্ণ সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হলে তাকে বলে কার। ‘অ’ ভিন্ন অন্য দশটি স্বরধ্বনির সংক্ষিপ্ত রূপ হয়। সুতরাং বাংলায় কার দশটি। এগুলো যথাক্রমে:

কারচিহ্নউদাহরণ
আ-কারাবাবা, মা, চাকা
ই-কারিপাখি, বাড়ি, চিনি
ঈ-কারীনীতি, শীত, স্ত্রী
উ-কারুখুকু, বুরু, ফুফু
ঊ-কারূমূল্য, চূর্ণ, পূজা
ঋ-কারৃকৃতী, গৃহ, ঘৃত
এ-কারেছেলে, মেয়ে, ধেয়ে
ঐ-কারৈবৈশাখ, চৈত্র, ধৈর্য
ও-কারোদোলা, তোতা, খোকা
ঔ-কারৌপৌষ, গৌতম, কৌতুক
মনে রাখো: কার ১০টি, ‘অ’-এর কোনো কার নেই।

খ. ফলা সহযোগে

খ.১. ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা

ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে বলে ফলা। ফলা যুক্ত হলে বর্ণের আকারের পরিবর্তন সাধিত হয়। বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা ছয়টি। যেমন:

ফলাচিহ্নউদাহরণ
ণ / ন-ফলাণ / নচিহ্ন, রত্ন, পূর্বাহ্ণ, অপরাহ্ণ, বিষ্ণু, কৃষ্ণ
ব-ফলা্ববিশ্বাস, নিঃস্ব, নিতম্ব
ম-ফলা্মতন্ময়, পদ্ম, আত্মা
য-ফলা্যসভ্য, অত্যন্ত, বিদ্যা
র-ফলা্রগ্রহ, ব্রত, স্রষ্টা
ল-ফলা্লক্লান্ত, অম্লান, উল্লাস

এ ছাড়া রেফ (র্) ব্যঞ্জনের মাথায় বসে। যেমন: বর্ণ, স্বর্ণ, তর্ক, খর্ব।

মনে রাখার কৌশল: ছয়টি ফলা: ন, ব, ম, য, র, ল। র-ফলা বসে ব্যঞ্জনের নিচে (্র), আর রেফ বসে ওপরে (র্)।

খ.২. স্বরবর্ণের সঙ্গেও ফলা

বাংলা স্বরবর্ণের সঙ্গেও ফলা যুক্ত হয়। যথা: অ্যাপোলো, অ্যাটম, অ্যাটর্নি, অ্যালার্ম ইত্যাদি ধ্বনি।

খ.৩. যুক্ত ব্যঞ্জনের সঙ্গে কার ও ফলা

বাংলা যুক্ত ব্যঞ্জনের সাথেও কার এবং ফলা যুক্ত হয়ে শব্দ গঠিত হয়। যেমন: সন্ন্যাস, সূক্ষ্ম, রুক্মিণী, সন্ধ্যা ইত্যাদি।

গ. ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ব্যঞ্জনবর্ণ

ফলা ছাড়া দুটি ব্যঞ্জনবর্ণ জুড়ে গিয়েও সংযুক্ত বর্ণ হয়। নিচে কতিপয় সংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ ও তাদের গঠন দেখানো হলো।

দুই বর্ণের যুক্ত

যুক্তবর্ণকীভাবে গঠিতউদাহরণ
ক্কক্ + কপাক্কা, ছক্কা, চক্কর
ক্তক্ + তরক্ত, শক্ত, ভক্ত
ক্ষক্ + ষ (উচ্চারণ ক্ + খ-এর মতো)শিক্ষা, বক্ষ, রক্ষা
ক্সক্ + সবাক্স
ঙ্কঙ্ + কঅঙ্ক, কঙ্কাল, লঙ্কা
ঙ্খঙ্ + খশৃঙ্খলা, শঙ্খ
ঙ্গঙ্ + গঅঙ্গ, মঙ্গল, সঙ্গীত
ঙ্ঘঙ্ + ঘসঙ্ঘ, লঙ্ঘন
চ্চচ্ + চউচ্চ, উচ্চারণ, উচ্চকিত
চ্ছচ্ + ছউচ্ছল, উচ্ছ্বাস, উচ্ছেদ
জ্জজ্ + জউজ্জ্বল, উজ্জীবন, উজ্জীবিত
জ্ঝজ্ + ঝকুজ্ঝটিকা
জ্ঞজ্ + ঞ (উচ্চারণ ‘গ্যঁ’-এর মতো)জ্ঞান, সংজ্ঞা, বিজ্ঞান
ঞ্চঞ্ + চঅঞ্চল, সঞ্চয়, পঞ্চম
ঞ্ছঞ্ + ছবাঞ্ছিত, বাঞ্ছনীয়, বাঞ্ছা
ঞ্জঞ্ + জগঞ্জ, রঞ্জন, কুঞ্জ
ঞ্ঝঞ্ + ঝঝঞ্ঝা, ঝঞ্ঝাট
ট্টট্ + টঅট্টালিকা, চট্টোপাধ্যায়, চট্টগ্রাম
ড্ডড্ + ডগড্ডালিকা, উড্ডীন, উড্ডয়ন
ণ্টণ্ + টঘণ্টা, কণ্টক
ত্তত্ + তউত্তম, বিত্ত, চিত্ত
ত্থত্ + থউত্থান, উত্থিত, অভ্যুত্থান
দ্দদ্ + দউদ্দাম, উদ্দীপক, উদ্দেশ্য
দ্ধদ্ + ধউদ্ধত, উদ্ধৃত, পদ্ধতি
দ্ভদ্ + ভউদ্ভব, উদ্ভট, উদ্ভিদ
ন্তন্ + তঅন্ত, দন্ত, কান্ত
ন্দন্ + দআনন্দ, সন্দেশ, বন্দী
ন্ধন্ + ধবন্ধন, রন্ধন, সন্ধান
ন্নন্ + নঅন্ন, ছিন্ন, ভিন্ন
ন্মন্ + মজন্ম, আজন্ম
প্তপ্ + তব্যাপ্ত, লিপ্ত, সুপ্ত
প্পপ্ + পধাপ্পা
প্সপ্ + সলিপ্সা, অভীপ্সা
ব্দব্ + দঅব্দ, জব্দ, শব্দ
ল্কল্ + কউল্কা, বল্কল
ল্গল্ + গফাল্গুন
ল্টল্ + টউল্টা
ষ্কষ্ + কশুষ্ক, পরিষ্কার, বহিষ্কার
স্কস্ + কস্কুল, স্কন্ধ
স্খস্ + খস্খলন
স্টস্ + টআগস্ট, স্টেশন
স্তস্ + তঅস্ত, সস্তা, স্তব্ধ
স্পস্ + পস্পষ্ট, স্পন্দন, স্পর্ধা
স্ফস্ + ফস্ফটিক, প্রস্ফুটিত
হ্মহ্ + মব্রহ্ম, ব্রাহ্মণ
সতর্কতা: ঞ্চ, ঞ্ছ, ঞ্জ ও ঞ্ঝ, এই চারটি সংযুক্ত বর্ণের উচ্চারণ ‘ন’ হলেও লেখার সময় কখনো নচ (অনচল), ন্ছ (বান্ছা), ন্জ (গন্জ) বা ন্ঝ (ঝন্ঝা) রূপে লেখা ঠিক নয়। সঠিক বানান: অঞ্চল, বাঞ্ছা, গঞ্জ, ঝঞ্ঝা।

দুইয়ের অধিক বর্ণের যুক্ত

এ ছাড়া বাংলা ভাষায় দুইয়ের অধিক বর্ণ সংযোগেও কিছু সংযুক্ত বর্ণ গঠিত হয়।

যুক্তবর্ণকীভাবে গঠিতউদাহরণ
ক্ষ্মক্ + ষ + ম-ফলাসূক্ষ্ম
ন্ত্র্যন + ত + র-ফলা (্র) + য-ফলা (্য)স্বাতন্ত্র্য
স্ত্রস্ + ত + র-ফলাঅস্ত্র, শাস্ত্র
ন্ত্রন্ + ত + র-ফলামন্ত্র, যন্ত্র

বিশেষ উচ্চারণের যুক্তবর্ণ

যুক্তবর্ণউচ্চারণউদাহরণ
ক্ষক্ + খ-এর মতোশিক্ষা, রক্ষা, বক্ষ
জ্ঞ‘গ্যঁ’-এর মতোজ্ঞান, সংজ্ঞা, বিজ্ঞান
ঞ্চ, ঞ্ছ, ঞ্জ, ঞ্ঝ‘ন’-এর মতো (ন্চ, ন্ছ, ন্জ, ন্ঝ)অঞ্চল, বাঞ্ছা, গঞ্জ, ঝঞ্ঝা

বর্ণ অনুযায়ী যুক্তবর্ণ মনে রাখার কৌশল

  • ক দিয়ে শুরু: ক্ক, ক্ত, ক্ষ, ক্স
  • ঙ দিয়ে শুরু: ঙ্ক, ঙ্খ, ঙ্গ, ঙ্ঘ
  • চ ও জ দিয়ে শুরু: চ্চ, চ্ছ, জ্জ, জ্ঝ, জ্ঞ
  • ঞ দিয়ে শুরু: ঞ্চ, ঞ্ছ, ঞ্জ, ঞ্ঝ
  • ট, ড, ণ দিয়ে শুরু: ট্ট, ড্ড, ণ্ট
  • ত, দ, ন দিয়ে শুরু: ত্ত, ত্থ, দ্দ, দ্ধ, দ্ভ, ন্ত, ন্দ, ন্ধ, ন্ন, ন্ম
  • প, ব, ল দিয়ে শুরু: প্ত, প্প, প্স, ব্দ, ল্ক, ল্গ, ল্ট
  • ষ, স, হ দিয়ে শুরু: ষ্ক, স্ক, স্খ, স্ট, স্ত, স্প, স্ফ, হ্ম

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (উত্তরসহ)

প্রশ্নউত্তর
সংযুক্ত বর্ণকে ইংরেজিতে কী বলে?Ligature
বাংলায় কার কয়টি?১০টি
কোন স্বরবর্ণের কার নেই?অ
বাংলায় ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা কয়টি?৬টি
ফলাগুলো কী কী?ন, ব, ম, য, র, ল
‘ক্ষ’ কোন দুই বর্ণের যুক্ত?ক্ + ষ
‘জ্ঞ’ কোন দুই বর্ণের যুক্ত?জ্ + ঞ
‘ক্ষ’-এর উচ্চারণ কেমন?ক্ + খ-এর মতো
‘জ্ঞ’-এর উচ্চারণ কেমন?‘গ্যঁ’-এর মতো
‘ঙ্গ’ কোন দুই বর্ণের যুক্ত?ঙ্ + গ
‘ঘণ্টা’ শব্দে কোন যুক্তবর্ণ আছে?ণ্ট
‘উদ্ভব’ শব্দে কোন যুক্তবর্ণ আছে?দ্ভ (দ্ + ভ)
‘ঝঞ্ঝা’ শব্দে কোন যুক্তবর্ণ আছে?ঞ্ঝ
‘শব্দ’ শব্দে কোন যুক্তবর্ণ আছে?ব্দ (ব্ + দ)
‘ব্রাহ্মণ’ শব্দে কোন যুক্তবর্ণ আছে?হ্ম (হ্ + ম)
‘স্ফটিক’ শব্দে কোন যুক্তবর্ণ আছে?স্ফ (স্ + ফ)
‘আত্মা’ শব্দে কোন ফলা আছে?ম-ফলা
‘বিদ্যা’ শব্দে কোন ফলা আছে?য-ফলা
‘গ্রহ’ শব্দে কোন ফলা আছে?র-ফলা
‘ক্লান্ত’ শব্দে কোন ফলা আছে?ল-ফলা
‘বর্ণ’ শব্দে ‘র’-এর যে রূপ আছে তার নাম কী?রেফ
‘সূক্ষ্ম’ শব্দে ‘ক্ষ্ম’ কীভাবে গঠিত?ক্ + ষ + ম-ফলা

সারসংক্ষেপ

  • দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি স্বর ছাড়া একসঙ্গে উচ্চারিত হলে তা সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি, তার লিখিত রূপ যুক্তব্যঞ্জনবর্ণ (ligature)।
  • সংযুক্ত ব্যঞ্জন তিনভাবে গঠিত হয়: কার, ফলা ও ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ব্যঞ্জনবর্ণ সহযোগে।
  • কার ১০টি। ‘অ’-এর কোনো কার নেই।
  • ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা ৬টি: ন, ব, ম, য, র, ল। রেফ (র্) আলাদা।
  • ক্ষ-এর উচ্চারণ ‘ক্খ’-এর মতো, জ্ঞ-এর উচ্চারণ ‘গ্যঁ’-এর মতো।
  • ঞ্চ, ঞ্ছ, ঞ্জ, ঞ্ঝ কখনো ন্চ, ন্ছ, ন্জ, ন্ঝ লেখা যাবে না।

অনুশীলনী

  1. সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি ও যুক্তব্যঞ্জনবর্ণ কাকে বলে? উদাহরণসহ লেখো।
  2. সংযুক্ত ব্যঞ্জন কয়ভাবে গঠিত হয়? প্রতিটির একটি করে উদাহরণ দাও।
  3. কার কাকে বলে? সবগুলো কারের নাম, চিহ্ন ও উদাহরণ লেখো।
  4. ফলা কাকে বলে? বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের ছয়টি ফলার নাম ও উদাহরণ লেখো।
  5. কার ও ফলার পার্থক্য কী?
  6. নিচের যুক্তবর্ণগুলো ভেঙে লেখো: ক্ষ, জ্ঞ, ঙ্গ, ত্ত, ন্দ, স্ক, ঞ্চ, হ্ম, ল্ক, দ্ধ।
  7. নিচের শব্দগুলোতে কোন যুক্তবর্ণ আছে লেখো: শক্ত, শিক্ষা, সঙ্গীত, বিজ্ঞান, উদ্দেশ্য, স্তব্ধ, ঝঞ্ঝাট, ব্রহ্ম।
  8. ‘ক্ষ’ ও ‘জ্ঞ’-এর উচ্চারণ কেমন? উদাহরণ দাও।
  9. ‘ঞ্চ’, ‘ঞ্জ’ ইত্যাদি যুক্তবর্ণ লেখার সময় কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়?
  10. দুইয়ের অধিক বর্ণের যুক্ত দুটি সংযুক্ত বর্ণের উদাহরণ দাও।