ভাষার সংজ্ঞা
মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে কণ্ঠধ্বনির পাশাপাশি হাত, পা, চোখ ইত্যাদির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইশারাও ব্যবহার করে। কিন্তু ইঙ্গিতের সাহায্যে বেশি কিছু বোঝানো যায় না। কণ্ঠধ্বনির সাহায্যে যত বেশি মনোভাব সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করা সম্ভব, ইঙ্গিতে তা সম্ভব নয়। তাই ভাষার মূল উপাদান হলো ধ্বনি।
ভাষার উপাদান: ধ্বনি ও বাগযন্ত্র
ভাষা তৈরির পেছনে কাজ করে কয়েকটি ধাপ:
- বাগযন্ত্র: মুখগহ্বর, কণ্ঠ, নাক, জিহ্বা, দাঁত, তালু ইত্যাদি অঙ্গ, যেগুলোর সাহায্যে আমরা ধ্বনি উচ্চারণ করি।
- ধ্বনি: বাগযন্ত্র দিয়ে উচ্চারিত আওয়াজ। এই ধ্বনিই ভাষার মূল উপাদান।
- ধ্বনিসমষ্টি: কয়েকটি ধ্বনি মিলে তৈরি হয় অর্থবোধক শব্দ, আর শব্দ মিলে বাক্য।
- বাক্প্রত্যঙ্গ: বাগযন্ত্রের মতো এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্যেই ভাষা উচ্চারিত হয় বলে একে বাক্প্রত্যঙ্গ বলা হয়।
ভাষা কীভাবে তৈরি হয়
আমরা যে শব্দ ব্যবহার করি, তা আসলে কোনো বস্তু বা ভাবের প্রতীক (Symbol) মাত্র। বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকতে গিয়ে মানুষ নিজের মনোভাব প্রকাশের জন্য বিভিন্ন বস্তু ও ভাবের জন্য বিভিন্ন ধ্বনির সাহায্যে শব্দ সৃষ্টি করেছে। তাই একই বস্তুর জন্য দেশে দেশে ভিন্ন শব্দ পাওয়া যায়।
| বস্তু | বাংলা | ইংরেজি | হিন্দি |
|---|---|---|---|
| পানি | জল / পানি | water | পানী |
| মা | মা | mother | মাঁ |
| বই | বই | book | কিতাব |
একই বস্তু, কিন্তু প্রতীক আলাদা। এতে বোঝা যায়, শব্দ ও বস্তুর মধ্যে কোনো স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই, মানুষ নিজেরা মেনে নিয়েই শব্দ ঠিক করেছে।
ভাষার বৈশিষ্ট্য
- ধ্বনিনির্ভর: ভাষা মূলত উচ্চারিত ধ্বনির ওপর নির্ভর করে।
- অর্থবোধক: ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির একটি নির্দিষ্ট অর্থ থাকতে হবে। অর্থহীন আওয়াজ ভাষা নয়।
- প্রতীকধর্মী: শব্দ বস্তু বা ভাবের প্রতীক।
- সমাজনির্ভর: একটি জনগোষ্ঠী একসঙ্গে মেনে নেয় বলেই ভাষা কাজ করে।
- পরিবর্তনশীল: সময়ের সঙ্গে ভাষা বদলায়। হাজার বছর আগের মানুষের ভাষা আজকের মতো ছিল না।
ভাষা ভিন্ন ভিন্ন হয় কেন
সকল মানুষের ভাষাই বাগযন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট। তবুও একই ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির অর্থ বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হতে পারে। এ কারণে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর জন্য আলাদা আলাদা ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। দেশ, কাল ও পরিবেশের পার্থক্যের কারণেও ভাষায় পরিবর্তন আসে।
বিশ্বের ভাষা ও বাংলা ভাষা
- বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত আছে।
- এর মধ্যে বাংলা একটি ভাষা। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা।
- বাংলাদেশের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বাংলা। এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের কয়েকটি অঞ্চলের মানুষও বাংলায় কথা বলে।
- যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশে বাঙালিরা বসবাস করেন।
- বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ত্রিশ কোটি লোকের মুখের ভাষা বাংলা।
ভাষা ও ইঙ্গিতের পার্থক্য
| বিষয় | ভাষা | ইঙ্গিত |
|---|---|---|
| মাধ্যম | বাগযন্ত্রের ধ্বনি | হাত, পা, চোখ ইত্যাদির নড়াচড়া |
| প্রকাশক্ষমতা | সূক্ষ্ম ও জটিল ভাব প্রকাশ করা যায় | সীমিত ভাব প্রকাশ করা যায় |
| উদাহরণ | ‘আমি কাল বই কিনব।’ | মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝানো |
সারসংক্ষেপ
- বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সংকেতই ভাষা।
- ভাষার মূল উপাদান ধ্বনি।
- শব্দ হলো বস্তু বা ভাবের প্রতীক।
- দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষা আলাদা হয়।
- বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা।
অনুশীলনী
- ভাষা কাকে বলে? উদাহরণসহ লেখো।
- ভাষার মূল উপাদান কী? বুঝিয়ে লেখো।
- বাগযন্ত্র কী? কয়েকটি বাগযন্ত্রের নাম লেখো।
- বিভিন্ন দেশে ভাষা ভিন্ন হয় কেন?
- নিচের কোনটি সঠিক? বাংলা ভাষা পৃথিবীর (ক) দ্বিতীয় (খ) তৃতীয় (গ) চতুর্থ (ঘ) পঞ্চম বৃহৎ মাতৃভাষা।
